‘অভিযোগ থাকলে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া যেত, এভাবে প্রাণ কেড়ে নেওয়া কেন?’ কান্নায় ভেঙে পড়লেন রাজিয়া
শিলিগুড়ি: গরু চোর সন্দেহে গণপিটুনির অভিযোগকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ছড়াল শিলিগুড়ি সংলগ্ন মাটিগাড়া ও বাগডোগরা থানা এলাকায়।
অভিযোগ, সন্দেহভাজন একটি গাড়িকে ঘিরে ব্যাপক ভাঙচুর চালানোর পর তাতে আগুন ধরিয়ে দেয় উত্তেজিত জনতা। ঘটনায় এমডি সাঈদ আক্তার নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর জখম হয়েছেন আরও এক ব্যক্তি। তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত মাটিগাড়া থানার অন্তর্গত তারাবাড়ি এলাকার বালাসন নদীর ধারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার ভোররাতে ওই এলাকায় একটি সন্দেহভাজন গাড়িকে ঘোরাফেরা করতে দেখেন কয়েকজন বাসিন্দা।
সম্প্রতি শিলিগুড়ি শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় রাতের অন্ধকারে গবাদি পশু চুরির একাধিক অভিযোগ ওঠায় স্থানীয়দের মধ্যে আগে থেকেই আতঙ্ক ছিল। সেই কারণে ওই গাড়িটিকে ঘিরে গরু চোরের সন্দেহ তৈরি হয়।
এরপর মুহূর্তের মধ্যে বহু মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে গাড়িটিকে ঘিরে ফেলেন বলে অভিযোগ।
শুরু হয় ভাঙচুর। গাড়ির ভিতরে থাকা ব্যক্তিদের ওপরও চড়াও হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ, গণপিটুনির পর এক ব্যক্তিকে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানা গিয়েছে।
হামলায় আরও এক ব্যক্তি গুরুতর আহত হন। তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, মাটিগাড়া থানা এলাকায় সন্দেহভাজনদের ব্যবহৃত আরও একটি গাড়িতেও ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কয়েকজন ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় বলেও স্থানীয় সূত্রের দাবি।
খবর পেয়ে মাটিগাড়া ও বাগডোগরা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনার পর বালাসন নদীর তীরবর্তী এলাকায় ব্যাপক ভিড় জমে যায়। এলাকায় উত্তেজনা থাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশ গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। মৃত ও আহত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ ও এলাকার সিসিটিভি ফুটেজও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
পাশাপাশি গবাদি পশু চুরির অভিযোগগুলিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তান নিয়ে দিশেহারা স্ত্রী
এদিকে মৃত এমডি সাঈদ আক্তারের স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা ঘটনার খবর পেয়ে এদিন বাগডোগরা থানায় যান।
সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির দাবি জানান রাজিয়া।
রাজিয়ার দাবি, তাঁর স্বামী গত কয়েক বছর ধরে লাইনম্যানের কাজ করতেন। এলাকার সকলেই জানতেন, তিনি গরু লাইনম্যানের কাজ করতেন।
শারীরিকভাবে বিভিন্ন সমস্যায় ভুগলেও প্রতিদিন রাত আটটা নাগাদ বাড়ি থেকে কাজে বেরিয়ে সকালে বাড়ি ফিরতেন সাঈদ আক্তার।
স্বামীকে হারিয়ে এখন তিন সন্তানকে নিয়ে কীভাবে সংসার চালাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রাজিয়া। তাঁর তিন সন্তানের মধ্যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
রাজিয়া বলেন, তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে কারও কোনও অভিযোগ বা সন্দেহ থাকলে তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া যেত। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এভাবে একজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
ঘটনার সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় এখনও উত্তেজনা রয়েছে।
পুরো ঘটনার নেপথ্যে কী ছিল ও গণপিটুনির ঘটনায় কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে জানা গেছে।















































