গাজন সন্ন্যাসীদের কঠোর সাধনা, ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রা, মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখরিত গ্রাম-শহর
মালদা: চৈত্র মাসের অন্তিম লগ্নে বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অন্যতম প্রধান আকর্ষণ চড়ক পুজা ঘিরে এ বছরও রাজ্যের সর্বত্র তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ।
গাজন উৎসব-এর অন্তর্গত বাঙালির এই প্রাচীন ধর্মীয় আচার শুধুমাত্র ভক্তির প্রকাশ নয়, বরং বাংলার লোকঐতিহ্য, সামাজিক সংহতি ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিফলন।
এই পুজোকে কেন্দ্র করে সপ্তাহখানেক আগেই শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি।
গ্রামবাংলার বিভিন্ন চড়কতলায় তৈরি হয় অস্থায়ী মণ্ডপ, সাজানো হয় চড়ক গাছ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় আশপাশের এলাকা।
স্থানীয় মানুষজন স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে এই আয়োজনকে সফল করে তোলেন।
অনেক জায়গায় স্থানীয় ক্লাব ও সংগঠনগুলিও সক্রিয় ভূমিকা নেয়।
চড়ক পুজোর মূল আকর্ষণ গাজন সন্ন্যাসীদের তপস্যা।
ভক্তরা সন্ন্যাস গ্রহণ করে কয়েকদিন কঠোর ব্রত পালন করেন সাথে নিরামিষ আহার গ্রহণ করেন, কেউ কেউ উপবাসে থাকেন।
পুজোর দিন তাঁরা ভগবান শিব-এর উদ্দেশ্যে নিজেদের শরীরের কষ্ট সহ্য করে ভক্তির প্রকাশ ঘটান।
আগুনের উপর দিয়ে হাঁটা, কাঁটার শয্যায় শোয়া, শরীরে শূল ফোঁড়া বা হুকের সাহায্যে চড়ক গাছে ঝুলে ঘোরা – এই সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান দর্শকদের মধ্যে বিস্ময় ও শ্রদ্ধার সঞ্চার করে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘চড়ক গাছ’ ঘিরে আচার, যেখানে একটি উঁচু কাঠের খুঁটির মাথায় দড়ি বেঁধে সন্ন্যাসীরা হুকের মাধ্যমে ঝুলে ঘোরেন।
যদিও আধুনিক সময়ে নিরাপত্তার কারণে এই প্রথার অনেকটাই প্রতীকী রূপ নেওয়া হয়েছে, তবুও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তা বিভিন্ন স্থানে পালিত হচ্ছে।
উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শোভাযাত্রা। রঙিন পোশাকে সজ্জিত গাজন সন্ন্যাসী, ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টা, লোকসংগীত ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে শোভাযাত্রা গ্রাম ও শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়ায়।
এই শোভাযাত্রা দেখতে ভিড় জমায় হাজার হাজার মানুষ।
অনেক জায়গায় এই শোভাযাত্রায় স্থানীয় লোকশিল্পীরা অংশ নিয়ে পরিবেশন করেন বিভিন্ন লোকনৃত্য ও পালাগান।
চড়ক পুজোকে কেন্দ্র করে বসে বিশাল মেলা। এই মেলায় পাওয়া যায় স্থানীয় হস্তশিল্প, মাটির জিনিস, খেলনা, পোশাক ও নানা রকম মুখরোচক খাবার।
শিশুদের জন্য নাগরদোলা, বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে।
সন্ধ্যা নামতেই আলোর রোশনাই, মাইকিং ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখরিত হয়ে ওঠে মেলাপ্রাঙ্গণ।
অনেক জায়গায় অনুষ্ঠিত হয় যাত্রাপালা, কীর্তন, বাউল গান ও নাট্যপ্রদর্শনী, যা উৎসবের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
এই উপলক্ষে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ভিড় নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন করা হয় পুলিশ বাহিনী, স্থাপন করা হয় সিসিটিভি ক্যামেরা।
পাশাপাশি স্বাস্থ্য শিবির, প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র ও দমকলের ব্যবস্থাও রাখা হয় যাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, চড়ক পুজোর মাধ্যমে ভগবান শিবের আশীর্বাদ লাভ হয় ও মানুষের জীবনের দুঃখ-কষ্ট দূর হয়।
কৃষিনির্ভর বাংলায় এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নতুন বছরের আগমনের আনন্দ ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলালেও চড়ক পুজোর মূল সুর – ভক্তি, ত্যাগ ও লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য আজও অমলিন।
গ্রাম থেকে শহর, সর্বত্র এই উৎসব এক অনন্য সামাজিক মিলনক্ষেত্র তৈরি করে, যেখানে ধর্ম, সংস্কৃতি ও মানুষের আন্তরিক বন্ধন একসূত্রে গাঁথা হয়।












































