শিলিগুড়ি: বিকেল থেকে গভীর রাত প্রায় আট থেকে নয় ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর অবশেষে সফল হল শিলিগুড়ির হাসপাতাল মোড়ের হাইভোল্টেজ উদ্ধার অভিযান।
বুধবার বিকেল থেকে মোবাইল টাওয়ারের চূড়ায় উঠে থাকা অজ্ঞাতপরিচয় যুবককে ঘিরে তৈরি হওয়া নাটকীয় পরিস্থিতির অবসান ঘটে রাত প্রায় সাড়ে ১১টা নাগাদ। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর যুবককে নিরাপদে নিচে নামিয়ে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পুলিশ সূত্রে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, যুবকের নাম বাদশা। তাঁর শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তাঁর মানসিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ ও মেডিক্যাল পরীক্ষার পরই তাঁর প্রকৃত শারীরিক ও মানসিক অবস্থা স্পষ্ট হবে।
বুধবার বিকেলে হাসপাতাল মোড় সংলগ্ন এলাকায় মোবাইল টাওয়ারের অনেক উঁচুতে ওই যুবককে দেখতে পান স্থানীয়রা। কীভাবে তিনি টাওয়ারের চূড়ায় উঠলেন, তা নিয়ে তৈরি হয় রহস্য।
স্থানীয়দের দাবি, কেউ তাঁকে টাওয়ারে উঠতে দেখেননি।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ, দমকল, এনডিআরএফ, এসডিআরএফ- সহ একাধিক উদ্ধারকারী দল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কিউআরটি টিমও মোতায়েন করা হয়।
টাওয়ারের চারপাশে নিরাপত্তাজাল বিছিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন ডিসিপি ট্রাফিক কাজী শামসুদ্দিন আহমেদ, এসিপি ট্রাফিক সুবীর দত্ত, এসডিও শিলিগুড়ি বিকাশ রোহেলা-সহ একাধিক আধিকারিক।
উদ্ধার অভিযান সহজ করতে দুই বিশেষ পর্বতারোহীও এগিয়ে আসেন। পর্বতারোহী নিহাল এবং তাঁর দলের এক সদস্য টাওয়ারে উঠে যুবকের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করেন। পাশাপাশি এসডিআরএফের চার সদস্যের বিশেষ দলও টাওয়ারে ওঠে। ড্রোনের সাহায্যে উপর থেকে যুবকের গতিবিধির উপর নজর রাখা হয়।
তবে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। অভিযানের শেষদিকে শুরু হয় বৃষ্টি। ভিজে টাওয়ার এবং অন্ধকারে উদ্ধারকাজ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এরপরও উদ্ধারকারীরা ধৈর্য ধরে যুবককে বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যান।
টাওয়ারে পৌঁছে প্রথমে তাঁকে শান্ত করা হয় ও দীর্ঘক্ষণ সেখানে থাকার কারণে জল খাওয়ানো হয়। এরপর শুরু হয় তাঁর একের পর এক অদ্ভুত দাবি। দাবি পূরণ করা হলে তবেই নিচে নামবেন বলে জানান তিনি। প্রথমে মাংস-ভাত চাওয়া হয়। তাঁর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর চকলেট, জুস-সহ আরও বিভিন্ন খাবার পাঠানো হয়।
কিন্তু তাতেও নিচে নামতে রাজি হননি বাদশা। একসময় তিনি দাবি করেন, তাঁকে হেলিকপ্টারে করে ঘোরাতে হবে। এমনকি পোস্ত দিয়ে কুমড়ো ভাজা খাওয়ার মতো আরও বেশ কিছু অস্বাভাবিক দাবিও করেন বলে জানা গিয়েছে।
কোনওরকম জোরজবরদস্তি না করে দীর্ঘক্ষণ কথাবার্তা ও বোঝানোর মাধ্যমে শেষপর্যন্ত তাঁকে নিচে নামতে রাজি করানো হয়। রাত প্রায় সাড়ে ১১টা নাগাদ স্ট্রেচারের সাহায্যে নিরাপদে তাঁকে টাওয়ার থেকে নামিয়ে আনেন উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা। শিলিগুড়ি সিভিল ডিফেন্সের ভলেন্টিয়ার কৃষ্ণ বর্মন ও তাঁর সহযোগীরাও উদ্ধার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
উদ্ধারের পর আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা অ্যাম্বুলেন্সে করে বাদশাকে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সিভিল ডিফেন্সের ভলেন্টিয়ার কৃষ্ণ বর্মন জানান, নানা কৌশলে বোঝানোর পর ওই ব্যক্তিকে নিচে নামানো সম্ভব হয়েছে। গোটা অভিযান অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য ছিল বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে এসিপি ইস্ট রবিন থাপা জানান, উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। দীর্ঘ আট থেকে নয় ঘণ্টার প্রচেষ্টার পর যুবককে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা পরীক্ষা করার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। উদ্ধার অভিযানে সাহসিকতার সঙ্গে অংশ নেওয়া পর্বতারোহী নিহাল ও তাঁর দলের সদস্যদের বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান তিনি।
দীর্ঘ এই অভিযানে পুলিশ, দমকল, এনডিআরএফ, এসডিআরএফ, সিভিল ডিফেন্স ও পর্বতারোহীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় শেষপর্যন্ত স্বস্তি ফেরে হাসপাতাল মোড় এলাকায়। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত টাওয়ারের চূড়ায় আটকে থাকা বাদশাকে জীবিত ও নিরাপদে উদ্ধার করাই এদিনের অভিযানের সবচেয়ে বড় সাফল্য।















































