কলকাতা: দৃষ্টিশক্তির সমস্যা যাতে কোনও শিশুর পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেই লক্ষ্যেই দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ের বৈশ্বিক জনহিতকর উদ্যোগ ‘প্রজেক্ট রাইজ’ ও সিবিএম ইন্ডিয়া ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে শুরু হল ‘ভিশন ফর এভরি চাইল্ড’ কর্মসূচি। চার মাসব্যাপী এই স্কুলভিত্তিক চক্ষু স্বাস্থ্য কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে কলকাতার টপসিয়া রোডের বুরহানি কমপ্লেক্সে।
পরে স্যার সৈয়দ আহমেদ হাই স্কুলে আয়োজন করা হয় প্রাথমিক চক্ষু পরীক্ষা শিবির।
এই কর্মসূচির আওতায় পশ্চিমবঙ্গ ও মধ্যপ্রদেশের ৩০টিরও বেশি সরকারি স্কুলের প্রায় ২০ হাজার পড়ুয়ার চোখ পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষায় দৃষ্টিশক্তির সমস্যা ধরা পড়লে প্রয়োজন অনুযায়ী শিশুদের বিনামূল্যে চশমা দেওয়া হবে।
পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে রেফার, চিকিৎসা সহ প্রয়োজন হলে অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রেও সহায়তা করা হবে।
শুধু পড়ুয়াদের চক্ষু পরীক্ষা নয়, কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শিক্ষক প্রশিক্ষণ। ২০০-রও বেশি শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যাতে তাঁরা শ্রেণিকক্ষে শিশুদের মধ্যে দৃষ্টিশক্তির সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ চিহ্নিত করতে পারেন। দূর থেকে ব্ল্যাকবোর্ড দেখতে না পাওয়া, পড়াশোনার সময় বারবার সমস্যায় পড়া-সহ বিভিন্ন লক্ষণের দিকে নজর রাখার বিষয়ে শিক্ষকদের সচেতন করা হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিবিএম ইন্ডিয়া ট্রাস্টের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর সোনি থমাস, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ তাপস রায়, সুশ্রুত আই ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চের চিকিৎসা পরিচালক ও সচিব ডঃ রতিশ চন্দ্র পাল, স্পেশাল অলিম্পিকসের সচিব অশোক চাকি, কলকাতায় শ্রী সৈয়দনা মুফাদ্দল সাইফুদ্দিনের প্রতিনিধিরা সহ চিকিৎসক, শিক্ষক ও দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ের সদস্যরা।
কলকাতার দাউদি বোহরাদের ‘প্রজেক্ট রাইজ’-এর সমন্বয়কারী তাহের তোতানাওয়ালা বলেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা এই দুই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে একত্রিত করেছে এই উদ্যোগ।
তাঁর কথায়, চিকিৎসাযোগ্য দৃষ্টিশক্তির সমস্যা যাতে কোনও শিশুর স্কুলজীবনকে পিছিয়ে না দেয়, সেটিই এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
সিবিএম ইন্ডিয়া ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক সোনি থমাস বলেন, শুধু চোখ পরীক্ষা করাই এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য নয়। যে শিশুর চশমা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন, তার যাতে পরবর্তী চিকিৎসাও নিশ্চিত হয়, সেই ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
স্যার সৈয়দ আহমেদ হাই স্কুলের অধ্যক্ষ মোহতাশিম সুলাইমান জানান, প্রাথমিক পরীক্ষায় বেশ কিছু শিশুর এমন সমস্যা ধরা পড়েছে, যা সহজেই চিকিৎসাযোগ্য।
অনেক শিশু দীর্ঘদিন ধরে ব্ল্যাকবোর্ড দেখতে সমস্যায় ভুগলেও চোখ পরীক্ষা করানোর সুযোগ পায়নি। সময়মতো পরীক্ষা হলে এই ধরনের সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করে চশমার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব বলে তিনি জানান।
এই কর্মসূচির আওতায় থাকা সরকারি স্কুলগুলির মধ্যে রয়েছে খিলা গোপীমোহন শিক্ষা সদন, তালবন্দি বেলায়েত আলি উচ্চ বিদ্যালয়, ব্রহ্মপাড়া চিন্তামণি ইনস্টিটিউশন, নয়াচক যদুনাথ উচ্চ বিদ্যালয়, দফরপুর প্রবর্তক বিদ্যামন্দির, লিলুয়া টিআরজি খেমকা স্কুল ও হাওড়া উর্দু গার্লস হাই স্কুল।
উদ্যোক্তাদের মতে, শিশুদের দৃষ্টিশক্তির সমস্যা অনেক সময় নীরবে তাদের পড়াশোনায় প্রভাব ফেলে। বিশেষত নিম্ন আয়ের পরিবার ও গ্রামীণ এলাকার শিশুদের নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করানোর সুযোগ কম থাকায় সমস্যা দীর্ঘদিন অজানা থেকে যায়।
এর ফলে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া থেকে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় শিশুদের।
‘ভিশন ফর এভরি চাইল্ড’ কর্মসূচিটি ভারতের ‘ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ফর কন্ট্রোল অফ ব্লাইন্ডনেস অ্যান্ড ভিজ্যুয়াল ইম্পেয়ারমেন্ট’ ও ‘রাষ্ট্রীয় বাল স্বাস্থ্য কার্যক্রম’-এর মতো সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হচ্ছে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।
‘প্রজেক্ট রাইজ’ ২০১৮ সালে শুরু হওয়া দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ের একটি বৈশ্বিক জনহিতকর উদ্যোগ। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য ও পুষ্টি, পানি ও স্যানিটেশন, পরিবেশ সংরক্ষণ সহ সামাজিক উন্নয়নের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ কাজ করে।
অন্যদিকে, সিবিএম ইন্ডিয়া ট্রাস্ট একটি অলাভজনক উন্নয়ন সংস্থা, যা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবিকা ও মানবিক সহায়তা নিয়ে কাজ করে। ২০২৪-২৫ সালে সংস্থাটি ভারতের ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ২০.৬ লক্ষেরও বেশি মানুষের কাছে পরিষেবা পৌঁছে দিয়েছে।















































